
“যখন কাঁটাতার দেখলাম, মনে হল সব শেষ… মনে হল, এই জীবনে আর দেশে ফিরতে পারব না। আমার দাদোর দাদো (ঠাকুরদার ঠাকুরদা) এই মুর্শিদাবাদেই থাকতেন। আমরা এখন ভগবানগোলা [ব্লকের] যে গ্রামে থাকি সেটাও আমার নানির গ্রাম।“
বালিয়া হোসেন নগর গ্রামে নিজের বাড়িতে বসে মুর্শিদাবাদ জেলার সঙ্গে তাঁর পরিবারের আজন্মকালের সম্পর্কের খতিয়ান দিচ্ছিলেন বছর ৩৬-এর মেহেবুব শেখ। চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। মাসখানেক আগেই ভয়ঙ্কর এক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। দেশের প্রশাসন তাঁকে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে দাগিয়ে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে সীমার ওপারে চালান করেছিল।
“আমার ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, রেশন কার্ড সবই আছে। গায়ে গতরে খেটে জমিও কিনেছি। তারপরেও আমি বাংলাদেশি হই কেমন করে?” জানতে চান মেহেবুব, পেশাগত পরিচয়ে তিনি পরিযায়ী শ্রমিক।
মেহেবুবের মতোই এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন তাঁর জেলাতুতো আরও হাজার হাজার দেশান্তরি শ্রমিকেরা। তাঁদের কেউ নির্মাণশ্রমিক, কেউ গৃহশ্রমিক, কেউ ফেরিওয়ালা, কেউ বা হকার। হঠাৎ নেমে আসা অস্তিত্বের সংকটে জেরবার দিন আনি দিন খাই এই মজুরদের ঠিক ঠাহর হচ্ছে না কেন মুর্শিদাবাদের বাংলাভাষী মুসলমান পরিযায়ী শ্রমিকেরা ভিনরাজ্যে কাজে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন।

![মুর্শিদাবাদের কান্দি ব্লকের গোকর্ণ গ্রামের বিশাখা মণ্ডল (নাম পরিবর্তিত) দিল্লিতে গৃহশ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন তিন দশক হল। তিনি বলছেন: 'আমাকে এখনও কেউ [আমরা ভারতীয় কিনা] কিছু বলেনি। কিন্তু চারদিকে এত ঝামেলা হচ্ছে [আমাদের মতো বাঙালি মুসলমানদের নিয়ে], আমরাও চিন্তিত'। Photo: Anirban Dey/PARI](https://admin.asiandispatch.net/uploads/editor-image-new/image_20250917175810580868ca90d0f2dc0.jpg)
(Left) স্ত্রী সুরনা বিবির সঙ্গে মুর্শিদাবাদের বালিয়া হোসেন নগরে নিজেদের বাড়িতে মেহেবুব শেখ। ২০২৫-এর ৯ জুন এই পরিযায়ী রাজমিস্ত্রিকে তুলে নিয়ে যায় মহারাষ্ট্র পুলিশ, তাঁর নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে কাগজপত্র চায়। শেষপর্যন্ত তাঁকে জোর করে বাংলাদেশে রেখে আসা হয়।
(Right) মুর্শিদাবাদের কান্দি ব্লকের গোকর্ণ গ্রামের বিশাখা মণ্ডল (নাম পরিবর্তিত) দিল্লিতে গৃহশ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন তিন দশক হল। তিনি বলছেন: ‘আমাকে এখনও কেউ [আমরা ভারতীয় কিনা] কিছু বলেনি। কিন্তু চারদিকে এত ঝামেলা হচ্ছে [আমাদের মতো বাঙালি মুসলমানদের নিয়ে], আমরাও চিন্তিত’। Photos: Anirban Dey/PARI
“আমাকে এখনও কেউ [আমরা ভারতীয় কিনা] কিছু বলেনি,” বলেন বছর বাহান্নর বিশাখা মণ্ডল (নাম পরিবর্তিত)। কান্দি ব্লকের গোকর্ণ গাঁয়ে তাঁর ঘর। “কিন্তু চারদিকে এত ঝামেলা হচ্ছে [আমাদের মতো] বাঙালি মুসলমানদের নিয়ে, আমরাও চিন্তিত।” দিল্লিতে তিন দশক ধরে গৃহশ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। পাঁচ বাড়ি খেটে মাসে ২৫০০০ টাকা আয় করেন। ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড সবই যথাযথ আছে তাঁর। রয়েছে আধার কার্ড, মায় দিল্লির ঠিকানার সঙ্গে লিংক করা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও।
ইংরেজরা কলকাতায় রাজধানী স্থানান্তরের আগে পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলার প্রশাসনিক কেন্দ্র মুর্শিদাবাদ পরিচিত ছিল তার সম্পদ আর প্রাচুর্যের জন্য। বর্তমানে অবশ্য তার পরিচয় রাজ্যের সর্বাধিক পরিযায়ী শ্রমিক সরবরাহকারী জেলা হিসেবে। ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত পাওয়া হিসেব অনুযায়ী মুর্শিদাবাদ জেলার মোটামুটি ৪ লক্ষ শ্রমিক পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার স্কিমে নাম নথিভুক্ত করেছেন।[আশ্চর্যের বিষয়, উক্ত নথি অধুনা অপ্রকাশিত হয়েছে সরকারি সাইট থেকে]। বিভিন্ন পরিযায়ী সংগঠনের বেসরকারি হিসেব বলছে মুর্শিদাবাদ জেলায় পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ১০ লক্ষেরও বেশি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা দপ্তরের জনৈক সরকারি আধিকারিক এও জানান, “সরকারি কোনও পরিসংখ্যানেই নাবালক শ্রমিকদের উল্লেখ থাকবে না। কিন্তু বাস্তব এটাই যে জেলার অসংখ্য নাবালক শ্রমিক বাইরে কাজে যাচ্ছে প্রতিদিন।“
মেহেবুব শেখের দাদা ৩৩ বছরের মুজিবর শেখ আর বাবা হোসেন শেখও ছিলেন পরিযায়ী শ্রমিক। ষাটের কোঠার গোড়ায় পৌঁছে হোসেন আজও কলকাতা শহরে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। ভাইয়ের সঙ্গে মুজিবরও দিল্লি, মুম্বইয়ে রাজমিস্ত্রির কাজে গিয়েছেন। এখন গাড়ি চালান তিনি। দুই ভাই-ই চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বড়ো হয়েছেন। মেহেবুব বলছেন, “এক সময় গ্রামে অন্যদের বাড়িতে ছাগলও চরিয়েছি। স্কুলে বেশিদিন যাইনি। অভাবের সংসার। ছোটো থেকেই খাটছি।”

‘এখন বরং ভালো আছি। ফিরে এসে কলকাতায় এই কাজ নিয়েছি। বাড়ির কথা মনে পড়ে,’ বলেন মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানের বাবু ইসলাম (আসল নাম জানাতে চাননি)। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ ওড়িশায় বাঙালি মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার শুরু হলে সেখান থেকে পালিয়ে আসেন তিনি। Photo: Smota Khator/PARI
সতেরোয় পা দিয়েই, বংশ পরম্পরায় শেখা রাজমিস্ত্রির বিদ্যেটুকু সম্বল করে কাজের তাগিদে ভিনরাজ্যে পাড়ি জমান মেহেবুব। সেই থেকে দিল্লি, পঞ্জাব, তামিলনাডু, রাজস্থান-সহ বিভিন্ন রাজ্যে কাজ করে আসা এই ওস্তাদ রাজমিস্ত্রি বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে চারপাশ এতটা বদলে যাবে। মেহেবুবের মতো বহু পরিযায়ী শ্রমিককে সন্দেহের বশে গ্রেফতার করে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পাঠিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও সামনে এসেছে সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট আর প্রকাশিত নানান প্রত্যক্ষ বয়ান এবং অভিজ্ঞতার মারফত।
বাতাসে ভাসছে সন্দেহ আর অবিশ্বাসের বিষ। তাতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই: এক বছরেরও বেশি সময় ধরে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো আক্রমণ শানিয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। “আমাদের নামগুলো শুনতে আপনাদের মতো না। সেজন্যই আমাদের এই অবস্থা,” ক্ষুব্ধ স্বরে বলেন মুজিবর। গত একবছর যাবত পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাইরে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকরা নিশানা হচ্ছেন বারবার। ‘বাংলাদেশি’, ‘রোহিঙ্গা’, ‘ঘুসপেটিয়া,’ ‘অনুপ্রবেশকারী’, ‘ইল্লিগাল’ ইত্যাদি তকমা জুটছে তাঁদের।
বিগত এক দশকে ধর্ম, ভাষা, জাতি তথা স্থানিক পরিচিতির ভিত্তিতে যে বিদ্বেষমূলক আচরণ নিয়ম করে বেড়েছে, প্রত্যেকেই খেয়াল করেছেন সেটা। বর্তমান বাড়বাড়ন্ত সেসবেরই এক চরম পর্যায়। মৌলবাদী সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদের ঘৃণাপ্রসূত বয়ান তথা ভাষণের জেরে সর্বাধিক আক্রান্ত হয়েছেন মুসলমান পরিযায়ী শ্রমিকেরা।
“হয় জান, নয় কাম, একটা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছি আমরা,” এই প্রতিবেদকের কাছে ক্ষোভ উগরে দেন ডিয়ার জালি বাগিচার বাসিন্দারা। এখানেই ইটের গাঁথনি দেওয়া প্লাস্টার বিহীন দুই কামরার ঘরে থাকেন ৩২ বছরের নাজেমা বিবি, উত্তরপ্রদেশের কানপুরে কর্মরত স্বামীর জন্য ভয়ে-ভাবনায় দিন কাটছে তাঁর। “এখন কয়েক ঘণ্টা ফোন না ধরলেই বুক কাঁপে,” জানান তিনি।

মুর্শিদাবাদ জেলা জুড়ে স্থিতিশীল কাজের আকাল ও দিন গুজরানের জন্য যথেষ্ট মজুরির অভাবে শ্রমজীবী মানুষদের কাছে দেশান্তরি হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, হাওড়া স্টেশন থেকে অন্ধ্রপ্রদেশগামী ট্রেনে ওঠার অপেক্ষায় আছেন তরুণ পরিযায়ী শ্রমিকেরা । Photo: Anirban Dey/PARI
চলতি বছরের জুন মাসের প্রথম দিকে ঈদ উল আজহা সপরিবারে পালন করবেন বলে মে মাসেই বালিয়া হোসেন নগর ফিরেছিলেন মেহেবুব। বহুকষ্টে তিল তিল করে দাদা, ভাই, বাবা – তিন রাজমিস্ত্রি মিলে আড়াই তলা পাকা বাড়িটা বানিয়েছেন। ৫টা ঘর। নিচে দোকান করার মতো কিছুটা জায়গা রাখা। গৃহিণী স্ত্রী সুরনা বিবি (৩০) আর তিন সন্তানকে নিয়ে মেহেবুব যে দিকটায় থাকেন সেদিকে এখনও ভিতর বা বাইরে কোথাও-ই প্লাস্টার হয়নি। বড়ো ছেলে বকুল শেখ (১৬) পড়াশোনা ছেড়ে এখন কাছেই একটা দোকানে কাজ করে। বাকি দুই ছেলে সাগর শেখ (১২), রেহান শেখ (৭) স্কুলে পড়ছে। মেহেবুব ঈদে ফিরেছেন দেখে বাড়ির সব আত্মীয় পরিজনেরা মিলে পবিত্র কুরবানির জন্য পশুর ব্যবস্থাও করেছিলেন।
কিন্তু বাধ সাধল কাজের চাপ। থানে শহরে যে ইমারতি সাইটে কাজ করতেন তিনি, “সেখান থেকে বারবার ফোন আসতে থাকে।” অগত্যা পরিবারের সঙ্গে পরব না কাটিয়েই প্লেনে চেপে মহারাষ্ট্র ফিরে রাজমিস্ত্রির কাজে যোগ দেন মেহেবুব।
জুন মাসের ৯ তারিখ কাজের ফাঁকে খানিক বিরতি নিয়ে কাছেই একটা দোকানে চা খেতে বেরিয়েছিলেন তিনি। হঠাৎ সেখান থেকেই তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় থানের মীরা রোডে শ্রী এল আর তিওয়ারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পাশে পুলিশ চৌকিতে। রাতেই সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় মীরা রোড পুলিশ স্টেশনে। দেখতে চাওয়া হয় কাগজ।
“’তুই বাংলাদেশি?’ হিন্দিতে এই প্রশ্নই করছিল পুলিশ অফিসাররা। আমি বলি, ‘আমার বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে’। আধার কার্ড, প্যান কার্ড দেখাই। পুলিশ বলে, ‘এসব পাঁচ টাকায় পাওয়া যায়’,“ প্রতিবেদককে জানালেন মেহেবুব।
কোনও মতে থানা থেকেই লুকিয়ে বাড়িতে ফোন করে সব কথা জানান তিনি। বালিয়া হোসেন নগরে তাঁর পরিবারের সদস্যরা তক্ষুনি যোগাযোগ করেন তাঁদের স্থানীয় মহিষাস্থলী গ্রাম পঞ্চায়েতের সঙ্গে। সেখান থেকেও যাবতীয় নথিপত্র পাঠানো হয় মহারাষ্ট্রের মীরা রোড থানায়। “চারদিন ধরে চলে অসহ্য মানসিক নির্যাতন। সারাদিন থানার বাইরে বসিয়ে রাখত। রাতে পাঠিয়ে দেওয়া হত একটা পুলিশ ক্যাম্পে।“
যদিও মেহেবুবের বয়ানে উঠে আসা নিজেদের যাবতীয় অপরাধ সটান খারিজ করে মীরা রোডের পুলিশ। সিনিয়র ইন্সপেক্টর মেঘনা বুরাডে জানান, তাঁদের কোনও “দোষ ছিল না” এবং এক পুলিশ কমিশনারের আদেশমাফিকই মেহেবুব শেখ সহ বাকিদের আটক করা হয়।

‘হয় জান, নয় কাম, একটা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছি আমরা,’ বলছেন লাগাতার ধরপাকড় ও ‘বাংলাদেশি ঘুসপেটিয়া’ তকমায় দিশেহারা পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকরা । Illustration: Labani Jangi/PARI
মেহেবুবর জন্য, অবশ্য ১৩ জুন দিনটা ছিল ভয়াবহ।
“সেদিন থানা থেকে আমাদের বড়ো একটা জাল দেওয়া গাড়িতে তোলা হয়। সামনে পিছনে আরও অনেক গাড়ি। মনে হচ্ছিল, নেতা মন্ত্রী যাচ্ছে,” বলছেন মেহবুব। “গাড়ি পানভেলের সিকিউরিটি ফোর্সের ক্যাম্পে এসে থামে।“
১৪ তারিখ সেই একই গাড়ি করে মেহেবুব-সহ প্রায় তিরিশ জনকে নিয়ে যাওয়া হয় পুণে বিমান বন্দরে। দুপুর ২টোয় বিমানে তোলা হয়। নামার পর মেহেবুব বুঝতে পারেন, পশ্চিমবঙ্গের বাগডোগরা বিমান বন্দরে এসে পড়েছেন। তাঁর কথায়, “এয়ারপোর্টে গুণতি করা হয়। আমাদের ছোটো ছোটো গ্রুপে ভাগ করে দেয়। আসামীদের গুণতির কথা শুনেছি। আমাদেরও এই রকম গুণতি কেন হচ্ছে? সন্দেহ হয়…” এয়ারপোর্ট থেকে তাঁদের আনা হয় শিলিগুড়ির বিএসএফ এর ছাউনিতে। সেখান থেকে অজানা গন্তব্যের পথে যাত্রা শুরু হয়।
“প্রায় পাঁচ, ছয় ঘণ্টা গাড়িতে গিয়েছি। যেখানে নামাল সেখানে জঙ্গল। একটা ছোটো বিএসএফ’এর ক্যাম্প। অল্প কয়েকজন অফিসার। নামিয়ে প্রশ্ন করল, ‘বাড়ি কোথায়?’ ঠিকানা বললাম। বেধড়ক মার শুরু হল। গলায় বন্দুক অবধি ঠেকানো হল। এরপর বিএসএফ অফিসাররা আমাদের ছবি তুলল। বলল, হেঁটে চলে যেতে জঙ্গল দিয়ে।”
“কোথায় যাব? কীভাবে যাব কিছুই জানি না। অনেকে বলছে, বিএসএফ বা বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) দেখলে গুলি করে দেবে। ভয় হচ্ছিল। জঙ্গলে লুকিয়ে থাকলাম সারারাত,” আতঙ্কের সেই রাতের কথা জানাচ্ছেন বিধ্বস্ত সন্ত্রস্ত মেহেবুব।


(Left) ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে মুর্শিদাবাদের সদর শহর বহরমপুরে একটি মিছিলের ডাক দেয় ওয়েস্ট বেঙ্গল মাইগ্রান্ট ওয়ার্কাস ইউনিয়ন। Photo: Anirban Dey/PARI
(Right) ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর নেমে আসা অত্যাচার নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু সংবাদ-শিরোনামের কোলাজ। Photo: Aunshuparna Mustafi/PARI
সকাল হতেই কষ্ট বেড়েছে। পুণে বিমান বন্দরে তাঁদের খেতে দিয়েছিল বিএসএফ। তারপর আর ২৪ ঘণ্টা পেটে কিচ্ছুটি পড়েনি। বলছেন, “মনে হচ্ছিল এখানেই মরে যাব। চারদিকে শুধুই গাছ। আমরা কয়েকজন একসঙ্গে থাকছিলাম।” খানিক থেমে আবারও বলেন মেহেবুব, “দুপুর ২টো নাগাদ হাঁটতে হাঁটতে যেখানে গেলাম সেখানে বাংলাদেশের ছোটো একটা বসতি ছিল। ওদের গিয়ে বললাম যে আমরা ভারতীয়। ওরা আমাদের স্নান করতে বলল, ভাত খেতে দিল। [ওদের সাহায্যে] ইমো অ্যাপ [আন্তর্জাতিক কল এবং চ্যাট করার মোবাইল অ্যাপ] থেকে বাড়িতে ফোন করলাম। কাঁদছিলাম। কথা বলতে পারছিলাম না…”
সেই অবস্থা থেকে যে কোনওদিন ফিরে আসবেন, ভাবতে পারেননি। মেহেবুব শেখকে উদ্ধারের জন্য তাঁর দাদা মুজিবর শিলিগুড়ি, রায়গঞ্জ কত না জায়গায় ছোটাছুটি করেছেন। স্থানীয় পঞ্চায়েত অফিস থেকে শুরু করে জেলা আর রাজ্য প্রশাসনের নানান সরকারি কর্তাব্যক্তির দ্বারস্থ হয়েছেন। অবশেষে মেহেবুব ফিরতে পেরেছেন ঘরে। “মেহেবুবকে উদ্ধার করে নিয়ে আসার পরেও বাড়িতে সরকারি লোকজন এসেছে। জমির কাগজও দেখতে চেয়েছে।“ তবে তাঁরা কোন দপ্তর থেকে এসেছিলেন সেটা পরিবারের কাছে স্পষ্ট নয়।
ফিরে এসেও চিন্তা আর শেষ হচ্ছে কোথায়? তাঁদের জন্য বাইরে যাওয়া যে আর ছাড়া গতি নেই, সেকথাই বুঝিয়ে বলেন মেহেবুব। “ভিনরাজ্যে দিনে যে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা আয় হয়, ঘরে বসে তো সেসব বন্ধ। অনেকসময় ওখানে আবার ডবল শিফটেও কাজ করি আমরা।“ অথচ মনে গেড়ে বসেছে চরম ভয়। বলছেন, “বছরের পর বছর পুণে, মুম্বই, থানে শহরে রাজমিস্ত্রির কাজ করেছি। এইরকম দিন দেখব কখনও ভাবিনি।”


(Left) ১৫ জুন উদ্ধার পাওয়ার পর নিরাপত্তা আধিকারিকদের সঙ্গে নাজিমুদ্দিন মণ্ডল (কালো শার্ট গায়ে), মোস্তফা কামাল শেখ (লাল শার্ট গায়ে) ও মিনারুল শেখ (বাঁদিকে)। ১৩ জুন জবরদস্তি বাংলাদেশ পাঠিয়ে দেওয়া হয় এই তিন পরিযায়ী শ্রমিককে ।
(Right) পশ্চিমবঙ্গ থেকে বহির্গামী শ্রমজীবীদের অধিকার নিয়ে কর্মরত সংগঠন পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের তরফ থেকে পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর হামলার বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থাগ্রহণের দাবি জানিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। Photos: Courtesy of Parijayee Shramik Aikya Mancha via PARI
সাংবাদিক দেখেই মুর্শিদাবাদেরই হরিহরপাড়া ব্লকের নাজিমুদ্দিন মণ্ডল নিজের রাগ বিরক্তি উগরে দেন। সরকার, প্রশাসনের পাশাপাশি তাঁর সমান ক্ষোভ সংবাদমাধ্যমকে ঘিরেও। যবে থেকে রাষ্ট্রের হাতে ঘাড়ধাক্কা খেয়ে বাংলাদেশ পৌঁছনো নাজিমুদ্দিনের একটি ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, সাংবাদিকরা প্রশ্নে প্রশ্নে জেরবার করে তুলেছেন তাঁকে। পেশায় রাজমিস্ত্রি, তরতিপুর গ্রামের ৩৫ বছর বয়সি নাজিমুদ্দিনকে হঠাৎ বাংলাদেশি তকমা দিয়ে ওদেশে ঠেলে দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হচ্ছে বারবার। ক্ষোভে ফেটে পড়েন তিনি, “কি করবেন জেনে? আপনারা লিখতে পারেন না কেন [আমাদের উপর] অত্যাচার করা হচ্ছে? কেন আমাদের বাংলাদেশি বলা হচ্ছে? মিডিয়াকেও তো বলতে হবে।”
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিষয়ে মিডিয়ার বড়ো অংশের নীরবতা বিচলিত করে নাজিমুদ্দিনকে। অনেকেই যে আবার খবরের নামে বাংলাভাষী শ্রমিকদের ঘিরে সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি করতে তৎপর, সেটাও নজর করেছেন তিনি।
বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিজ্ঞতায় এখনও আতঙ্কিত নাজিমুদ্দিন। বাড়িতে ক্লাস টেনের পড়ুয়া মেয়ে আর স্ত্রীকে রেখে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে এখন রীতিমতো ভয় হচ্ছে তাঁর। “মীরা রোড [আমি] থানাতেও কাজ করেছি,” বলেন তিনি। রাজমিস্ত্রির কাজ, মেরামতি সবই করেছেন সেখানে। “সেই থানার লোকে এসেই মাঝরাতে ভাড়ার ঘর থেকে তুলে নিয়ে গেল। বলল, ‘বাংলাদেশি’। এ কেমন নিয়ম?” প্রশ্ন করছেন নাজিমুদ্দিন। মহারাষ্ট্র পুলিশ প্রশ্ন তুলেছিল জন্ম সার্টিফিকেট নিয়ে। নাজিমুদ্দিন বলছেন, “৩৫ বছর আগে জন্ম হরিহরপাড়ায়। এখানেই বাপ, দাদাদের জন্ম। বাবা, মা কেউই পড়াশোনা জানেন না। জন্মসার্টিফিকেটও তোলেননি। আমার বাড়ির অবস্থা খুব খারাপ ছিল। আমি প্রাইমারি স্কুলটাও পাশ করিনি।”
মহারাষ্ট্রের মীরা রোডে সেই ঘরে এখনও জিনিসপত্র পড়ে আছে। ঠিকাদারের কাছে মজুরির টাকাও বকেয়া আছে। সেসবের কী হবে তারও কোনও ঠিক নেই। পুলিশ মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়েছে। সেই ফোনও ফেরত পাননি। “নতুন জায়গায় কাজ খোঁজা মুশকিল। পাঁচ বছর ধরে যে জায়গাটা তৈরি হয়েছে। সেটা এইভাবে কেড়ে নেওয়া যায়?” প্রশ্ন তাঁর।

অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে মানুষজনকে লাগাতার হেনস্থা নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য তরজার মাঝে চাপা পড়ে যাচ্ছে গোড়ার প্রশ্নটাই: মুর্শিদাবাদে যদি ঠিকঠাক কাজের সুযোগ থাকত, কৃষিক্ষেত্রে যদি একটুও সুযোগ-সুবিধে মিলত – বাসিন্দাদের কি আদৌ মিজোরাম (ছবিতে) কি মহারাষ্ট্রের মতো নানান রাজ্যে পাড়ি দিতে হত? Photo: Smita Khator/PARI
নাজিমুদ্দিনের অন্য দুই ভাইও পরিযায়ী শ্রমিক। একজন কেরালায়, অন্যজন তামিলনাড়ুতে কাজ করেন। এলাকার শ্রমিকরা প্রতিবেদককে জানাচ্ছেন, দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে বাঙালি শ্রমিকদের উপর তেমন অত্যাচার হচ্ছে না। তাই মহারাষ্ট্র, গুজরাট, দিল্লি থেকে ফিরে আসা শ্রমিকরা এখন মরিয়া হয়ে দক্ষিণের রাজ্যে কাজ খুঁজছেন।
মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা ১ ব্লকের কাজিসাহা গ্রামের বাসিন্দা মিনারুল শেখ এবং বর্ধমান জেলার মন্তেশ্বর থানা এলাকার বাসিন্দা মোস্তফা কামাল শেখকেও তাঁর সঙ্গে একই দুর্ভোগের শিকার হতে হয়েছিল বলে জানান নাজিমুদ্দিন। “১৩ জুন আমাদের শিলিগুড়ি দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। উদ্ধার পাই ১৫ জুন।
“যা হয়ে গেল… এরপর বাইরে যাওয়াই এখন মুশকিল। দেশে দিনে [যে-কদিন কাজ জোটে] ৫০০ টাকা রোজগার। ২৫০ টাকা খরচ। বাইরে [ভিনরাজ্যে] ৩০০ টাকা খরচ হলেও [আয়] ৮০০ টাকা রোজ। ৫০০ টাকা হাতে থাকে। বাড়িতে পাঠাতে পারি। তাই বাইরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই,” সহজ হিসেবটা বুঝিয়ে বলছেন নাজিমুদ্দিন। “ঝুঁকি নিয়েই [বাইরে] কাজে ফিরে যেতে হবে।“
জেলা জুড়ে মজুরি নির্ভর নিয়মিত কাজ অমিল। যা মজুরি মেলে তাতে দিন গুজরান অসম্ভব। বন্ধ মনরেগার ১০০ দিনের কাজও। অগত্যা দেশান্তরি হওয়া ছাড়া আয়ের আর পথ নেই শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে। দেশের অনগ্রসরতম জেলাগুলির মধ্যে অন্যতম মুর্শিদাবাদ পরিসংখ্যানের নিরিখে আদতে গ্রামীণ – জেলার শতকরা ৮০ শতাংশ মানুষ ২,১৬৬টি গ্রামে বাস করেন। শতকরা ৬৬ শতাংশ সাক্ষরতার হার নিয়ে মুর্শিদাবাদ রাজ্যের গড় ৭৬ শতাংশের চেয়ে অনেকখানি নিচে অবস্থান করছে (তথ্যসূত্র: জনগণনা ২০১১)। মুর্শিদাবাদের মোট জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশই মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত। ফলে এই অবশ্যম্ভাবী অভিবাসন এবং সে সংক্রান্ত যাবতীয় সমস্যার সর্বাধিক ভুক্তভোগী শ্রেণি, ধর্ম, আঞ্চলিক পরিচিতির নিরিখে জেলার প্রান্তিকতম মুসলিম জনগোষ্ঠী।
ভগবানগোলার হাবাসপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ডিয়ার জালি বাগিচা গ্রামের দিকে তাকালেই ছবিটা স্পষ্ট হয়ে যায়। এই গ্রামে ষাট শতাংশেরও বেশি বাড়ির অন্তত একজন ভিনরাজ্যে আছেন। এখানকার বাসিন্দা লতিবুল হক, আইনাল হক, আমির হোসেন, রাজ্জাক হোসেন শেখ মুটে শ্রমিকের কাজ ছেড়ে ফেরিওয়ালা হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন ওড়িশার ঝাড়সুগুডায়, খানিক ভদ্রস্থ রোজগারের আশায়। ফোনে জানান, তাঁরা মহাজনের কাছ থেকে হরেক মনিহারি মালপত্র বাকিতে নিয়ে সেসব সাইকেল, বাইকে করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করেন। ঠিকাদারের ভাগটুকু বাদ দিলে গড়পড়তা দৈনিক ৭০০-৮০০ টাকা আয় থাকে। দলবেঁধে ঘর ভাড়া নিয়ে একসঙ্গে থাকেন তাঁরা।


(Left) ওড়িশার ঝাড়সুগুডার লাখনপুর থানায় চারদিন আটক রাখা হয়েছিল মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলা ১ ব্লকের এই পরিযায়ী শ্রমিকদের দলটিকে। পশ্চিমবঙ্গে তাঁদের দেশ-গাঁ দক্ষিণ হনুমন্ত নগর গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে হস্তক্ষেপ করার পর ১১ জুলাই ছাড়া পান তাঁরা। Photo: Courtesy of WB Migrant Workers’ Union via PARI
(Right) মুর্শিদাবাদের লালবাগ থানা এলাকার এই তিন পরিযায়ী শ্রমিক – মিলন শেখ, ইসমাইল শেখ ও বাবু শেখ – তামিলনাড়ুর চেন্নাইয়ের একটি নির্মাণক্ষেত্রে কাজ করেন। ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই নিজেদের মধ্যে বাংলায় কথা বলায় আক্রান্ত হতে হয় তাঁদের । Photo: Courtesy of Parijayee Shramik Aikya Mancha via PARI
ডিয়ার জালি বাগিচা গ্রামে তাঁদের পরিবারের লোকেরা জানালেন, গত সেপ্টেম্বর (২০২৪) মাস থেকেই মুর্শিদাবাদের অনেক বাঙালি মুসলিম ফেরিওয়ালাকে ওড়িশায় কাজ করতে গিয়ে আক্রান্ত হতে হচ্ছিল, চলছিল ধরপাকড়। কখনও বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সমস্যার অজুহাত দেখিয়ে, কখনও মুর্শিদাবাদ জেলার সামশেরগঞ্জে ধর্মীয় উত্তেজনার দায়ে তাঁরা হয়রানির শিকার হচ্ছিলেন। তবে ক্রমশ ওড়িশা পুলিশও আরও বেশি করে এই কাজে মদত দেওয়ায় প্রমাদ গুনছেন শ্রমিকরা।
লতিবুল হকের কাগজপত্রের সত্যতা নিয়ে সেখানকার পুলিশের তরফ থেকে প্রশ্ন তোলা হলে, ডিয়ার জালি বাগিচায় তাঁর পরিবারের সদস্যরা ভগবানগোলা থানার দ্বারস্থ হন। থানা থেকে নথি পাঠানোর পরে ছাড়া হয় লতিবুল সহ বাকি শ্রমিকদের। তবে এখনও তাঁরা ওড়িশাতেই আটকে আছেন। ঝাড়সুগুডার একটি ক্যাম্পে প্রায় চারদিন বন্দি থাকা লতিবুল হক ফোনে জানালেন, “পুলিশ বলল আমরা ভারতীয় কিনা সেই কাগজ যাচাই হচ্ছে। একমাস রাজ্যে যাওয়া যাবে না।“
মহারাষ্ট্র, ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশ, দিল্লির মতো বিদেশবিভুঁইয়ে থাকা শ্রমিকদের কথা ভেবে দেশগাঁয়ে চরম ত্রাসে দিন কাটাচ্ছে পেছনে ফেলে আসা তাঁদের পরিবারগুলিও। ডিয়ার জালি বাগিচা গ্রামের এমন কয়েকটি বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আইনাল হকের মা, বছর ষাটের মদিনা বিবির সঙ্গে সাক্ষাৎ হল। উৎকণ্ঠায় জর্জরিত প্রৌঢ়ার শরীর অশক্ত হলে কি হবে, চোখের দৃষ্টি প্রখর। নিবিড় হাতে কাঁথা বোনেন। কাঁথা বুনিয়ে, সেলাই করিয়ে নিয়ে কেউ কুড়ি টাকা, কেউবা তিরিশ টাকা দেন। তাতে সংসারের কিছুটা সাহায্য হয়। ভিনরাজ্যে আছে তাঁর ছেলে আর নাতিরা। তাঁদের উপর অত্যাচার, হেনস্থার প্রসঙ্গে চোখ ভিজে ওঠে তাঁর।
“যখন বলল, ছেলে, পোতা [নাতি] সবাই বাংলাদেশি তখন কি আর মন মানে?” আর্তি ছাপিয়ে ওঠে মদিনা বিবির গলায়। তাঁর মেজ ছেলে আইনাল হক আর বড়ো ছেলের দুই সন্তান আমির হোসেন, রাজ্জাক হোসেন চারদিন কাটিয়েছেন ওড়িশা পুলিশের হেফাজতে। “ছেলে আর দুই পোতাকে ওড়িশায় পুলিশ চারদিন ধরে আটকে রেখেছিল। ছাড়া পেয়েছে। কিন্তু ওই চারদিন আমিও ঘুমাতে পারিনি।”


(Left) নিজের ছেলের নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে খুঁটিনাটি তথ্য জানিয়ে নানান সরকারি আধিকারিকদের কাছে এই আবেদনপত্রই দাখিল করেন আটক হওয়া পরিযায়ী শ্রমিক সাগির হোসেনের বাবা। মুর্শিদাবাদের দক্ষিণ হনুমন্ত নগরের বাসিন্দা সাগিরের অবিলম্বে মুক্তির আবেদন জানান তিনি।Photo: Courtesy of WB Migrant Workers’ Union via PARI
(Right) আটক পরিযায়ী শ্রমিক আইনাল হকের স্ত্রী শিউলি বিবি, তাঁদের ছেলে, মা মদিনা বিবি আর বাবা মইনুল শেখ, ভগবানগোলার ১ ব্লকের ডিয়ার জালি বাগিচা গ্রামে নিজেদের বাড়িতে।Photo: Anirban Dey/PARI
আইনাল হকের স্ত্রী শিউলি বিবির কাছে ফোন এসেছিল। সেই ফোনেই ঘুম উড়েছিল সারা পরিবারের। আধার কার্ড, মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড সব জোগাড় করে পাঠাতে হয়েছে থানায়। এই সব কাগজপত্তর নিয়ে থানায় গিয়েছিলেন আইনাল হকের বাবা শেষ ষাটের মইনুল শেখ। বলছেন, “দেরি করে যাওয়ার জন্য থানাতে ধমকও খেয়েছি। কিন্তু কী করব? ছেলের কথা ভেবে বাকহারা হয়ে গিয়েছিলাম…”
সন্তানসন্ততির চিন্তায় মনের কোণে গভীর আতঙ্ক জেগে আছে মদিনা বিবির। “মাধ্যমিক দেওয়ার পর ছেলে (আইনাল) বলল পেটে খেতে হবে তো, কাজ করতে হবে। শুরুতে একটা ইটভাটায় মালিকের কাজকাম করে দিয়ে মাসে আটশো টাকা মজুরি পেত।“ তারপর টানা বহুদিন প্রতি বস্তার হিসেবে, “গোডাউনে কাজ করেছে বস্তা তোলার। সেখানেও মাসে দশ হাজারের বেশি আসত না। দেনা হচ্ছিল। তাই দুই বছর ধরে ছেলে বাইরে। পেট চালাতে গিয়ে এই রকম অবস্থায় পড়তে হবে কেন?” সওয়াল তাঁর। জানান, “[আমার] দাদাশ্বশুর, শ্বশুর, সবাই তো ইন্ডিয়ার। এখনও আতঙ্ক লেগে থাকে।”
ভগবানগোলা ১ ব্লকের চরলবণগোলা গ্রামের মধ্য তিরিশের আমিরুল শেখকে, ৭ জুলাই ওড়িশার ঝাড়সুগুডার লখনপুর থানায় আটক করা হয়। সেখানেই ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের আরও প্রায় তিরিশ জন শ্রমিক। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা কখনও ভগবানগোলা থানায় কখনও স্থানীয় দক্ষিণ হনুমন্তনগর গ্রাম পঞ্চায়েতে ছোটাছুটি করেছেন। থানায় জমা করেছেন দরখাস্ত। চারদিন পর আটক শ্রমিকেরা ছাড়া পান ওড়িশার লখনপুর থানা থেকে। স্পষ্টতই বিপর্যস্ত আমিরুল শেখ ফোনে জানালেন, “১০ বছর ধরে ওড়িশায় ফেরিওয়ালার কাজ করি। কিন্তু গত কয়েক বছরে সব যেন পালটে গেছে। আগেও অনেককে মারধোর করা হয়েছে। কিন্তু এবার তো সরাসরি বাংলাদেশিই বলে দেওয়া হচ্ছে।“ কাজ না করলে সংসার চলবে না, কাজেই এখনও ওড়িশাতেই থাকছেন আমিরুল।

বেলডাঙা ১ ব্লকের কুমারপুর ফেরিঘাটে এই বিহারফেরত তরুণ পরিযায়ী শ্রমিকেরাও জানান মুসলিম শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার কথা। Photo: Smita Khator/PARI
“এই বছরই মুর্শিদাবাদ জেলার ৫ হাজারেরও বেশি পরিযায়ী শ্রমিককে ওড়িশায় পুলিশি হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে,” জানাচ্ছেন আসিফ ফারুক। পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চ (পিএসএএম) নামে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বহির্গামী শ্রমজীবীদের অধিকার নিয়ে কর্মরত একটি সংগঠনের সম্পাদক তিনি। “ওড়িশার ঝারসুগুডা, পারাদ্বীপ সহ বিভিন্ন এলাকায় চার থেকে পাঁচদিন করে মুর্শিদাবাদের বহু শ্রমিককে পুলিশ ক্যাম্পে আটকে রেখে দেশের নাগরিকত্বের প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে।“
ওদিকে কেন্দ্র আর রাজ্য সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক তরজা অব্যাহত, দুদিকের নেতানেত্রীদের ভাষণে সেটাই স্পষ্ট হচ্ছে বারবার। তবে, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না তাতে। কয়েক মাস আগে কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রকের একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে পরিযায়ী শ্রমিকদের কল্যাণার্থে কেন্দ্র সরকারের গৃহীত নানান যোজনা আর প্রকল্পের কথা ফলাও করে বলা হয়েছে। অথচ তাঁদের উপর এহেন অত্যাচারের নিরিখে কোনওরকম সরকারি বিবৃতি তো আসেইনি, নিন্দাটুকুও জানানো হয়নি কেন্দ্রের তরফে।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে লাগাতার হেনস্থার মতো যেসব অনৈতিক কাজকর্মের অভিযোগ আনা হয়েছে, তার ভিত্তিতেও কোনও সরকারি বিবৃতি জারি করেনি সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ। ভগবানগোলার গ্রামবাসীদের কথায়: “নিচুপদের সেনা [অধস্তন বিএসএফ জওয়ানরা] বলছে, ‘আমরা তো ওপরওয়ালাদের হুকুমে কাজ করছি’।”
যদিও, নাগরিকদের অধিকার রক্ষা ও জবরদস্তি সীমান্ত-পার করানোর বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে রাজ্য সরকারের তরফে। পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের সম্পাদক আসিফ ফারুকের বয়ান, ইতিমধ্যেই “পশ্চিমবঙ্গ সরকার আক্রান্ত শ্রমিকদের উদ্ধারের চেষ্টা করছে।“ তিনি আরও জানাচ্ছেন, “এপ্রিল মাস থেকেই পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য হেল্পলাইন চালু করেছি আমরা।”


(Left) ভিনরাজ্যে আক্রান্ত শ্রমিক আর গ্রামে তাঁদের নিজের নিজের পরিবারের জন্য একটি হেল্পলাইন চালু করেছে ওয়েস্ট বেঙ্গল মাইগ্রান্ট ওয়ার্কাস ইউনিয়ন। Photo: Courtesy of WB Migrant Workers’ Union via PARI
(Right) উত্তরপ্রদেশের কানপুরে কর্মরত, পেশায় রাজমিস্ত্রি, ভাই রফিকুল ইসলামের জন্য চিন্তায় থাকেন ডিয়ার জালি বাগিচা গ্রামের সফিকুল ইসলাম। বাংলাভাষী মুসলিমদের ওপর হামলা, ধরপাকড় ও জবরদস্তি সীমান্ত পার করানোর মতো ঘটনা যে উত্তরোত্তর বাড়ছে ফেসবুক-সহ নানান সমাজমাধ্যমের কল্যাণে তা বেশ খেয়াল করেন বলে জানান সফিকুল। Photo: Anirban Dey/PARI
দেশজুড়ে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্থা অবিলম্বে বন্ধ করার দাবিতে কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলাও দায়ের করেছে পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চ। অন্য একটি সংগঠন – ওয়েস্ট বেঙ্গল মাইগ্রান্ট ওয়ার্কাস ইউনিয়নও ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তার দাবি নিয়ে ৩ জুলাই মুর্শিদাবাদের সদর শহর বহরমপুরে একটি মিছিল করে। ইউনিয়নের জেলা সম্পাদক কামাল হোসেন স্পষ্ট ভাষায় নিজেদের দাবি তুলে ধরেন, “যে যে রাজ্যে শ্রমিকরা আক্রান্ত হচ্ছেন, [নির্দিষ্ট] জেলার সাংসদদের সেই সব রাজ্যে গিয়ে হস্তক্ষেপ করতে হবে।“
এদিকে, কেন্দ্র-রাজ্যের দায় ঠেলাঠেলির মাঝে চাপা পড়ে যাচ্ছে গোড়ার প্রশ্নটাই: মুর্শিদাবাদে যদি ঠিকঠাক কাজের সুযোগ থাকত, কৃষিক্ষেত্রে যদি একটুও সুযোগ-সুবিধে মিলত – বাসিন্দাদের কি ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে হত আদৌ?
ওদিকে, বালিয়া হোসেননগর গ্রামে সংসারের অন্নসংস্থানের কি উপায় হবে ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছেন না তাড়া খাওয়া শ্রমিক মেহেবুব শেখ। “[নির্মাণ] কোম্পানির লোকজন কাজের জন্য ফোন করছে [মুম্বই থেকে]। কিন্তু জিম্মা (দায়িত্ব) নিতে চাচ্ছে না…”
জমাট হতাশা তাঁর গলায়: “এবার কোথায় কাজে যাব? সে প্রশ্নের উত্তর জানি না…”